রিযিক আসলে কী? ( আমার জীবনের সত্যি ঘটনার আলোকে)

ছোটবেলায় দাদার কাছে অনেকগুলো ধর্মীয় বই ছিল। উনি সুন্দর করে পড়তেন, আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। একটা বই ছিল—বইটা গল্প বলার স্টাইলে লেখা, কোনো রেফারেন্সের উল্লেখ নেই। তাই এর সত্যতা জানি না।

সেখানে মানুষের জীবনের শেষ সময়ে কী হয়, তা সম্পর্কে বলা হয়েছে। মৃত্যুর আগে রিযিকের ফেরেশতা এসে মৃত্যুপথযাত্রীকে বলে, “সারা বিশ্বজগত খুঁজেও তোমার জন্য কোনো রিযিকের বরাদ্দ পেলাম না।” এভাবে বাতাসের দায়িত্বের ফেরেশতাও এসে বিদায় নেয়।

সেই শিশুবয়সে বইয়ের বর্ণনাটি আমাকে ভাবিয়েছিল। এত বাতাস, এত খাবার, পানীয় থাকা সত্ত্বেও ফেরেশতা কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না—এটা কেমন কথা!

গ্রামে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও কিছু মানুষকে দেখতাম। শারীরিক সামর্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও তারা বেকার। কিছুই করছে না, যেখানে অন্য অনেকে অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সবকিছু সুন্দরভাবে ম্যানেজ করছে। ভাবতাম, এরা কিছুই করে না কেন? ভাবতাম, এরা অলস, নির্বোধ ইত্যাদি।

নিজের জীবন আমাকে ধাপে ধাপে শিক্ষা দিচ্ছে—রিযিক আসলে কী?

মনে করুন, আপনি সম্পদশালী মানুষ। আপনার যেকোনো কিছু কেনার সামর্থ্য আছে। কিন্তু আপনার রিযিক যদি এতে না থাকে, তাহলে আপনি সেটা উপভোগ করতে পারবেন না—পরিবেশগত, শারীরিক অসামর্থ্য বা ডাক্তারের পরামর্শগত কারণে।

অন্যদিকে, ক্রয়ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও অতি দরিদ্র কারো রিযিক থাকার কারণে সে সেটা পেয়ে যেতে পারে।

মোটামুটি অল্প বয়সেই উপার্জন শুরু করেছিলাম। তখনো ৮-৯ বছরের বড় ভাই শুরু করেনি। সেটা নিয়ে মনে সন্তুষ্টি ছিল। স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ ছিল। অনেক জায়গায় আমার চাইতেও বেশি বয়সী বা বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্নদের সাথে প্রতিযোগিতা করেও চাকরি পেয়েছি। মূলত এটা ছিল আমার রিযিক।

আবার রিযিক না থাকার কারণে যা যা সহজেই পাওয়ার কথা ছিল, তা পাইনি বা পাচ্ছি না। যেমন ধরুন, নানান প্রতিকূলতা পেরিয়ে পড়াশোনা যখন একটা পর্যায়ে আনলাম, ততদিনে কোভিড শুরু হয়ে গেছে। চাকরি পাওয়ার নির্ধারিত বয়সের সীমা শেষ হওয়ার পথে। যেসব জায়গায় ভাইভা দিলাম, সেখান থেকে কোনো সুখবর পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম, ভালো কিছুর জন্য সিরিয়াসলি ট্রাই করি। আগের চাকরি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আল্লাহ হয়তো অসন্তুষ্ট হলেন। এরপর আর কোথাও স্থির হতে পারলাম না। যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি জোটাতে পারলাম না। অপছন্দের কত কিছু করতে হয়েছে। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

গত জুনে চাকরি হারানোর পর যখন নানান জায়গায় ট্রাই করে কোনো সফলতা পাচ্ছিলাম না, তখন ভাবলাম—কত মানুষ অটো-রিকশা চালায়, আমিও ট্রাই করে দেখি। যেহেতু নগদ টাকার খুব প্রয়োজন ছিল বাজার করার জন্য। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, অন্তত ৮-১০টা অটোরিকশার গ্যারেজে ঘুরার পরেও কেউ আমাকে অটোরিকশা ভাড়ায় চালাতে দিতে রাজি হয়নি। আমার সরকারি আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স—এগুলোর কোনো মূল্যই যেন নেই। সবাই রেফারেন্স চায়!

এরপর যখন বাসায় রান্না করার আর কিছু ছিল না, তখন হঠাৎ একদিন এখানে পোস্ট দেওয়ার পর এক ভাই দয়া করে আমাদেরকে পুরো মাসের বাজার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আরও ২-৩ ভাই দিয়েছিলেন ক্যাশ (আজীবন তাদের জন্য দোয়া ও কৃতজ্ঞতা)। যা দিয়ে আমি ও আমার স্ত্রী মিলে স্ট্রিট ফুডের একটা ব্যবসা শুরু করেছিলাম। রাস্তায় বাচ্চাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একেকজন নানা প্রশ্ন করত। এরপর একজন কাস্টমার আন্টি আমাকে তার ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, যাতে উনি একটা চাকরি দিতে পারেন। ওনার ছেলে একটা চাকরি দিলেন মার্কেটিংয়ের, যেটা শেষ পর্যন্ত ৩ মাসও করতে পারিনি। টার্গেট পূরণ করতে না পারায় হারিয়েছি।

এরপর ধীরে ধীরে এখন আবার আগের পরিস্থিতি। কিছুদিন আগে একটা পোস্ট করেছিলাম। বেশিরভাগ কমেন্টই ছিল নেগেটিভ। কেউ কেউ বলেছেন, লেখাটা নাকি এআই দিয়ে লেখা, স্ক্যাম ইত্যাদি। যদি কোনো মানুষ জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে, সে উপলব্ধি করতে পারবে। কেউ কেউ সমালোচনা করেছেন—ক্যারিয়ারের এই অবস্থায় আমি কেন বিবাহ করেছি, বাচ্চা নিয়েছি ইত্যাদি। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, সবকিছু মূলত আল্লাহর নির্ধারিত রিযিক। আমি অনেক মানুষকে চিনি, যারা অনেক উপার্জন করেন কিন্তু বিবাহ করতে পারেননি। অনেকে দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তানের মা-বাবা হতে পারেননি।

যেখানেই যাচ্ছি, শেষ পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। কোনো কোনো জায়গায় এমন স্যালারির অফার আসে, যেটা আমি আরও ১২ বছর আগে অতিক্রম করেছিলাম। যা দিয়ে এখন এই ৩৩-৩৪ বছর বয়সে ২টি বাচ্চাসহ ৪ জনের পরিবারের কোনোভাবে ভদ্রস্থ জীবন যাপন সম্ভব নয়।

ছোটবেলায় দাদার মুখে শোনা মৃত্যুপথযাত্রীর কাছে আসা ফেরেশতার সেই গল্পটা অনেক মনে পড়ে। আমার রিযিকের দরজা কি বন্ধ হয়ে গেছে? চারিদিকে এত চাকরি, এত কর্মসংস্থান, এত আয়োজন, এত কর্মযজ্ঞ—কিন্তু আমার কোথাও কোনো সুযোগ নেই। আমার জন্য সব দরজা বন্ধ? কোনো সুযোগ নেই?

এ কারণে যারা আল্লাহর নিকট থেকে উত্তম রিযিক পেয়েছেন, তারা শুকরিয়া আদায় করুন। যারা পাননি, তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করুন—যাতে রিযিকের বন্ধ দরজা খুলে দেন, অপ্রশস্ত দরজা প্রশস্ত করে দেন এবং উত্তম রিযিক দান করেন।

Posted Mar 5, 2026, 11:31 AM UTC

6915
Loading comments…